সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে
নমস্কার বন্ধুরা। বিদ্যাঘর-এ আপনাদের সকলকে স্বাগত জানাই। আমাদের আজকের এই ভিডিওতে আমরা “সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে” এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব বা জানব।
কবি কামিনী রায়ের
সেই বিখ্যাত কবিতা ‘সুখ’-এর এই কালজয়ী পঙক্তিটি আমাদের শৈশব থেকেই এক গভীর নৈতিক শিক্ষার কথা মনে করিয়ে দেয়। এই কথাটির গভীরতা কেবল শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি জীবন দর্শন যা আমাদের সমাজ ও সভ্যতার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। আমরা যখন জন্ম নিই, তখন থেকেই আমরা কোনো না কোনোভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। শৈশবে মা-বাবার যত্ন, কৈশোরে শিক্ষকদের শিক্ষা, আর কর্মজীবনে সহকর্মীদের সহযোগিতা—এই সবকিছুই প্রমাণ করে যে মানুষ একা বাঁচতে পারে না।
সমাজ মানেই হলো একগুচ্ছ মানুষের সমাহার যারা একে অপরের প্রয়োজনে এগিয়ে আসে। আমরা যদি কেবল নিজেদের স্বার্থ নিয়ে চিন্তা করি, তবে সমাজ খুব দ্রুতই ভেঙে পড়বে। ভেবে দেখুন তো, একজন কৃষক যদি মনে করেন তিনি কেবল নিজের জন্যই শস্য ফলাবেন, তবে শহরের মানুষের খাবার আসবে কোথা থেকে? আবার একজন ডাক্তার যদি কেবল নিজের উপকারের কথা ভাবেন, তবে সাধারণ মানুষের চিকিৎসার কী হবে? এই প্রতিটি কাজই হলো পরের তরে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। এই পারস্পরিক নির্ভরতাই সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।
“সকলের তরে সকলে আমরা” কথাটির মানে হলো সামাজিক সংহতি। আমরা যখন কোনো উৎসবে মেতে উঠি বা কোনো বিপদে ঐক্যবদ্ধ হই, তখনই এই দর্শনের প্রতিফলন ঘটে। আর “প্রত্যেকে আমরা পরের তরে” অংশটি আমাদের ব্যক্তিগত দায়িত্বকে মনে করিয়ে দেয়। এটি আমাদের শেখায় যে কেবল নিজের উন্নতি নয়, বরং আমাদের প্রতিটি কাজের মাধ্যমে যেন অন্যের কোনো না কোনো উপকার হয়। মহৎ মানুষেরা সবসময়ই এই পথে হেঁটেছেন। মহাত্মা গান্ধী, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কিংবা বেগম রোকেয়া—তাঁদের প্রত্যেকের জীবনের মূল মন্ত্রই ছিল পরার্থপরতা। তাঁরা নিজেদের আরাম-আয়েশের কথা চিন্তা না করে সমাজের মঙ্গলের জন্য কাজ করে গেছেন।
আজকের আধুনিক পৃথিবীতে আমরা ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছি। প্রযুক্তির উৎকর্ষ আমাদের যোগাযোগ বাড়িয়ে দিলেও মনের দূরত্ব অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। আমরা এখন একই বাড়িতে থেকেও একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন। ঠিক এই সময়েই কামিনী রায়ের এই দর্শনের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, অন্যের অশ্রু মোছানোর মধ্যেই প্রকৃত সুখ লুকিয়ে আছে। কবি নিজেই প্রশ্ন করেছেন—’পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন মন সকলি দাও, তার মতো সুখ কোথাও কি আছে? আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’ অর্থাৎ নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ভুলে অন্যের কল্যাণে ঝাঁপিয়ে পড়লে যে প্রশান্তি পাওয়া যায়, তা অতুলনীয়।
মানবিকতা এবং সহমর্মিতা হলো মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণ। যখন আমরা অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়াই, তখন কেবল সেই ব্যক্তিটিই উপকৃত হন না, বরং আমাদের নিজেদের মানসিক বিকাশও ঘটে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা অন্যের সেবা করেন বা সমাজসেবামূলক কাজে যুক্ত থাকেন, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য অনেক ভালো থাকে। তাই পরের তরে কাজ করা মানে নিজেকেই সমৃদ্ধ করা।
বিশ্বায়ন বা গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে আমরা এখন একটি বড় পরিবারের সদস্য। এক দেশের সমস্যা এখন আর সেই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মহামারী কিংবা পরিবেশ দূষণের মতো সমস্যাগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে আমরা সবাই একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছি। তাই এখন কেবল নিজের দেশ বা নিজের সম্প্রদায়ের কথা ভাবলে চলবে না, বরং সমগ্র মানবজাতির মঙ্গলের কথা চিন্তা করতে হবে। এই বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধই হলো “সকলের তরে সকলে আমরা” দর্শনের আধুনিক রূপ।
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনেও আমরা এই দর্শনের চর্চা করতে পারি। ছোট ছোট কাজের মাধ্যমেই এর সূচনা হতে পারে। যেমন—রাস্তায় কোনো অসুস্থ মানুষকে সাহায্য করা, অভাবী কোনো শিক্ষার্থীকে বই দিয়ে সাহায্য করা, কিংবা পরিবেশ রক্ষায় একটি গাছ লাগানো। এই প্রতিটি কাজই আমাদের পরের তরে নিবেদিত প্রাণ হিসেবে গড়ে তুলবে। মনে রাখবেন, নদীর জল যেমন নিজে পান করে না, গাছ যেমন নিজের ফল নিজে খায় না, ঠিক তেমনি মানুষের জীবনের সার্থকতাও অন্যকে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যে।
পরিশেষে এটুকুই
বলা যায়, ঘৃণা আর বিভেদের এই পৃথিবীতে ভালোবাসার একমাত্র পথ হলো পরার্থপরতা। আমরা যদি একে অপরের হাত ধরি, তবে যেকোনো কঠিন বাধাই অতিক্রম করা সম্ভব। আসুন আমরা সবাই শপথ নিই যে, আমরা কেবল নিজের জন্য বাঁচব না, বরং আমাদের জীবন উৎসর্গ করব সাধারণ মানুষের কল্যাণে। তবেই সার্থক হবে আমাদের এই মানব জন্ম।
আমাদের আজকের
এই আলোচনাটি আপনাদের কেমন লাগল তা কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন। এই ধরনের শিক্ষামূলক এবং অনুপ্রেরণামূলক ভিডিও নিয়মিত পেতে বিদ্যাঘর চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে আমাদের সাথেই থাকুন। ভিডিওটি ভালো লাগলে লাইক দিন এবং আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন যাতে এই মহৎ বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছে যায়। সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন এবং মানুষের পাশে থাকুন। ধন্যবাদ।
PDF ডাউনলোড করুন
পিডিএফ ডাউনলোড করতে অবশ্যই বিদ্যাঘর ডটকম ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করতে হবে।